| বঙ্গাব্দ

ইরানের ইহুদি ইতিহাস: পাশ্চাত্যের প্রচারণার আড়ালে ২,৭০০ বছরের সহাবস্থান

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 26-05-2026 ইং
  • 15749 বার পঠিত
ইরানের ইহুদি ইতিহাস: পাশ্চাত্যের প্রচারণার আড়ালে ২,৭০০ বছরের সহাবস্থান
ছবির ক্যাপশন: ইরানের ইহুদি ইতিহাস

পাশ্চাত্যের প্রচারণার বাইরে ভিন্ন এক সত্য: ইরানের বুকে ২,৭০০ বছরের সমৃদ্ধ ইহুদি ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তব চিত্র

মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬: বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার চরম উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের কারণে পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমগুলোতে ইরানকে সাধারণত একটি কট্টর ইহুদি-বিদ্বেষী রাষ্ট্র হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। তবে এই রাজনৈতিক প্রচারণার আড়ালে রয়েছে এক বিস্ময়কর ঐতিহাসিক সত্য। পারস্য বা আধুনিক ইরানের বুক চিরে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় ২,৭০০ বছরের পুরোনো এক সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময় ইহুদি ইতিহাস।

২০১৫ সালের মার্চ মাসে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া এক হাই-প্রোফাইল ভাষণে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক চুক্তি ঠেকাতে বাইবেলের ‘এস্থার’ উপাখ্যানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে দাবি করেছিলেন যে, ইরান ইহুদিদের জন্য এক চিরন্তন অস্তিত্বের সংকট। অথচ ইতিহাস ও বাস্তবতার সমীকরণ বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।

পারস্যের প্রাচীন ইতিহাস, ইসলামের আগমন এবং বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রে ইহুদি সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের সেই অজানা কাহিনী নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. বাইবেলের উপাখ্যান বনাম পারস্যের বাস্তব ইতিহাস

ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, পারস্যের রাজা অহশ্বেরশ (ক্ষয়ার্শ) তৎকালীন ইহুদি সমাজকে এক বড় ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। রানী এস্থার ও তাঁর মামাতো ভাই মর্দখয়ের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক সমাধিটি আজও পশ্চিম ইরানের হামেদান শহরে একটি পবিত্র ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় সংরক্ষিত রয়েছে। এমনকি ২০০৮ সালে কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের শাসনামলেই এই সমাধিটিকে ইরানের ‘জাতীয় ঐতিহ্যবাহী স্থান’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক লিওর স্টার্নফেল্ড এবং অধ্যাপক ফারহাং জাহানপুরের মতে, মধ্যপ্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের অনেক দেশের তুলনায় ইরানে ইহুদি-বিদ্বেষের (Anti-Semitism) কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই বললেই চলে। এখানকার ইহুদিরা ইরানকে কোনো আমদানিকৃত দেশ নয়, বরং নিজেদের আদি বাড়ি মনে করেন এবং পারস্যের সংস্কৃতি, সাহিত্য, সংগীত ও রান্নার প্রতি গভীর নাড়ির টান অনুভব করেন।

২. ব্যবিলনীয় নির্বাসন থেকে পাহলভী আমল: ইহুদিদের আশ্রয়স্থল ইরান

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে ব্যবিলনীয় নির্বাসনের সময় থেকে ইরানে ইহুদিদের আগমন ও স্থায়ী বসবাস শুরু হয়। রাজা দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার কর্তৃক জুডিয়ার রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে তারা প্রথমে ইসফাহানে এবং পরবর্তীতে পুরো পারস্য মালভূমিতে ছড়িয়ে পড়েন। হিব্রু বাইবেলেও প্রাচীন পারস্যের রাজাদের উদারতার প্রশংসা করা হয়েছে।

  • ইসলামের আগমন: সপ্তম শতাব্দীতে পারস্যে ইসলামের আগমন এবং বাণিজ্য পথের প্রসারের ফলে ইহুদিদের এই অভিবাসন আরও বাড়ে। ইসলামে ‘আহলুল কিতাব’ বা কিতাবধারী হিসেবে ইহুদিদের স্বীকৃতি তৎকালীন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য এক বড় সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছিল।

  • রাজনৈতিক অধিকার: ১৯০৬ সালে কাজার রাজবংশের আমলে সংঘটিত সাংবিধানিক বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের ইহুদিরা দেশটির সংসদে (Majles) একটি স্থায়ী আসন লাভ করে, যা তাদের মুসলিম নাগরিকদের সমকক্ষ আইনি মর্যাদা ও নিরাপত্তা দেয়।

  • শরণার্থীদের আশ্রয়: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের কারণে জার্মানি থেকে বিতাড়িত বহু ইহুদি বুদ্ধিজীবী এবং ১৯৪১ সালে ইরাকের ‘ফারহুদ’ দাঙ্গার পর বিপুল সংখ্যক ইরাকি ইহুদি ইরানে আশ্রয় নেন। এমনকি যুদ্ধকালীন সময়ে ইরান প্রায় ৩ লাখ পোলিশ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল, যাদের মধ্যে হাজার হাজার ইহুদি শিশু ও নারী ছিল।

৩. ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব এবং আয়াতুল্লাহ খোমেনীর ঐতিহাসিক ফতোয়া

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব ইরানে ২৫০০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে একটি থিওক্র্যাটিক (ধর্মীয়) শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যার কেন্দ্রে ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী। এই বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্য তথা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির মোড় সম্পূর্ণ বদলে দেয়। অন্যদিকে, আয়াতুল্লাহ খোমেনীর দেওয়া ঐতিহাসিক ফতোয়াগুলো আন্তর্জাতিক আইন, বাকস্বাধীনতা এবং মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে।
বিপ্লব এবং খোমেনীর ঐতিহাসিক ফতোয়া সংক্রান্ত মূল বিষয়গুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব
  • মূল কারণ: মার্কিন-সমর্থিত শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পহলভির একনায়কতন্ত্র, পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ এবং চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য।
  • খোমেনীর ভূমিকা: নির্বাসন (প্যারিস) থেকে ক্যাসেট বার্তার মাধ্যমে জনগণকে শাহ-বিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেন।
  • ফলাফল: ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে শাহ দেশ ছেড়ে পালান। ১ ফেব্রুয়ারি খোমেনী দেশে ফেরেন এবং ১ এপ্রিল ইরানকে 'ইসলামি প্রজাতন্ত্র' ঘোষণা করা হয়। [1, 2, 3]
আয়াতুল্লাহ খোমেনীর ঐতিহাসিক ফতোয়া (The Historic Fatwas)
আয়াতুল্লাহ খোমেনী তাঁর জীবনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া (ধর্মীয় ডিক্রি) দিয়েছিলেন। তবে বিশ্ব রাজনীতি ও ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত দুটি ফতোয়া হলো:
┌────────────────────────────────────────────────────────┐
│               আয়াতুল্লাহ খোমেনীর প্রধান ফতোয়া           │
└───────────────────────────┬────────────────────────────┘
                            │
            ┌───────────────┴───────────────┐
            ▼                               ▼
  সালমান রুশদির মৃত্যুদণ্ড (১৯৮৯)       রাসায়নিক অস্ত্রের নিষেধাজ্ঞা
  - 'দ্য স্যাটানিক ভার্সেস' বইয়ের জন্য  - ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় জারি
  - বাকস্বাধীনতা বনাম ধর্মীয় আবেগের দ্বন্দ্ব  - গণবিধ্বংসী অস্ত্রকে ইসলাম বিরোধী ঘোষণা
১. সালমান রুশদির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া (১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৯)
  • প্রেক্ষাপট: ব্রিটিশ-ভারতীয় লেখক সালমান রুশদির উপন্যাস 'দ্য স্যাটানিক ভার্সেস' (The Satanic Verses)-এ ইসলাম ও মহানবী (সা.)-কে অবমাননা করা হয়েছে বলে মুসলিম বিশ্বে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়।
  • ফতোয়া: খোমেনী রেডিও তেহরানের মাধ্যমে রুশদি এবং এই বইয়ের প্রকাশনার সাথে জড়িত সবার মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া জারি করেন।
  • বৈশ্বিক প্রভাব: এটি যুক্তরাজ্য ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। পশ্চিমা বিশ্ব একে বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে দেখে, অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বের একটি বড় অংশ একে ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার ঢাল মনে করে।
২. রাসায়নিক ও গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিরুদ্ধে ফতোয়া (১৯৮০-র দশক)
  • প্রেক্ষাপট: ইরাক-ইরান যুদ্ধের (১৯৮০-১৯৮৮) সময় সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী ইরানের ওপর ব্যাপক রাসায়নিক হামলা চালায়।
  • ফতোয়া: ইরানি কমান্ডাররা পাল্টা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি চাইলে খোমেনী তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ফতোয়া দেন যে, গণবিধ্বংসী বা রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহার ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম (নিষিদ্ধ)
  • প্রভাব: এই ফতোয়াটি পরবর্তীকালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির পরমাণু অস্ত্র বিরোধী ফতোয়ার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটির প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ফতোয়া জারি করেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, "ইরানের ইহুদিরা এই জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং রাজনৈতিক আন্দোলন ‘জায়নিজম’-এর সঙ্গে সাধারণ ইহুদি ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই।" এই একটি ফতোয়া ইরানের ইহুদিদের জান-মালের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে এই সম্প্রদায়ের মিশ্র অভিজ্ঞতা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি (২০১৩-২০২১) ইহুদিদের জন্য উত্তরাধিকার আইন সহজ করা এবং শনিবার ‘শাবাত’ বা বিশ্রামের দিনে ইহুদি শিশুদের স্কুলে যাওয়া থেকে ছাড় দেওয়ার মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধে প্রাণ হারানো ইহুদি বীর সৈন্যদের স্মরণে তাঁর সরকার তেহরানে একটি বিশেষ স্মৃতিসৌধও উন্মোচন করেছিল।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও এসইও এক্সপার্ট হিসেবে আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো মনিটর করতে গিয়ে আমি দেখেছি, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে কীভাবে একটি জাতির দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক সম্প্রীতির ইতিহাসকে ধামাচাপা দেওয়া হয়। ইরানের ইহুদিরা ইসরাইলকে আধ্যাত্মিক পবিত্র স্থান মানলেও, রাজনৈতিক মাতৃভূমি হিসেবে ইরানকেই মনেপ্রাণে ধারণ করেন—এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটিই মধ্যপ্রাচ্যের প্রকৃত সৌন্দর্য।

৪. বর্তমান ইরানের ইহুদিদের সামাজিক অবস্থা

বর্তমানে ইরানে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ ইহুদি বসবাস করছেন, যা ইসরাইল ও তুরস্কের পর সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে তৃতীয় বৃহত্তম ইহুদি জনগোষ্ঠী। তেহরান, শিরাজ ও ইসফাহানের মতো বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতার মাত্রা বেশ উন্নত।

  • ধর্মীয় স্থাপনা: পুরো ইরানে বর্তমানে প্রায় ৬০টি সক্রিয় সিনাগগ (ইহুদি উপাসনালয়), ইহুদি স্কুল, কোশার কসাইখানা এবং বিশেষায়িত রেস্টুরেন্ট রয়েছে।

  • সাম্প্রতিক উদাহরণ: সম্প্রতি তেহরানে ইসরাইলি বিমান হামলায় একটি সিনাগগ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইরানের ইহুদি সম্প্রদায়, তাদের সংসদীয় প্রতিনিধি হোমাযুন সামেহ এবং ধর্মীয় নেতা রাব্বি ইউনেস হামামি লালেহজার যৌথভাবে এর তীব্র নিন্দা জানান। তারা এই হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আখ্যা দিয়ে বলেন, ইহুদিদের সুরক্ষার বিষয়ে ইসরাইলের দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ধ্বংসস্তূপ থেকে তোরাহ স্ক্রল বা পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলো যাতে অক্ষত উদ্ধার করা যায়, সেজন্য ভারি যন্ত্রপাতির বদলে ইরানি উদ্ধারকর্মীদের হাত দিয়ে সাবধানে কাজ করার সরকারি অনুরোধ প্রশাসন রক্ষা করেছিল।

এই ঘটনাটি পাশ্চাত্যের একপেশে প্রোপাগাণ্ডার বাইরে গিয়ে ইরানের ইহুদিদের প্রতি দেশটির প্রশাসন ও সাধারণ মুসলিমদের প্রকৃত পারস্পরিক সহাবস্থান এবং পরম শ্রদ্ধার এক অনন্য দলিল হিসেবে কাজ করে।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency